জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি নির্ধারণী মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়া নাগরিকদের অধিকার পুনরুদ্ধারই এবারের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য।
তারেক রহমান একটি স্বনির্ভর, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে বিএনপির কর্মপরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান অঙ্গীকারগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নাগরিকদের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার একটি বড় সুযোগ, যার বাস্তবতা বিবেচনা করেই বিএনপি প্রতিটি শ্রেণি ও পেশার মানুষের জন্য পরিকল্পনা সাজিয়েছে।
ভাষণের শুরুতে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দীর্ঘ আন্দোলন ও সহিংস দমন-পীড়নের পর জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফেরানোর একটি সন্ধিক্ষণ এসেছে বলে মন্তব্য করেন। বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, এই সময়ে গুম, খুন ও অপহরণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল। তিনি ‘আয়নাঘর’কে জীবিত মানুষের কবরস্থান হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ওই সময়ে প্রায় ১৪ শতাধিক মানুষ নিহত এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দেন এবং নিহতদের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেন।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তারেক রহমান। প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে পর্যায়ক্রমে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণের ঘোষণা দেন তিনি। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কথা জানান, যার মাধ্যমে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। নারীদের জন্য বিনা বেতনে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা অব্যাহত রাখা, কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং সার ও বীজে ভর্তুকি দেওয়া হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগ রাখার কথা বলেন।
স্বাস্থ্য খাতে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, সারা দেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগ দেওয়া হবে, যাদের বড় অংশ নারী। তারা ইউনিয়ন পর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেবেন।
প্রশাসন সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির অঙ্গীকার করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সরকারি কর্মচারীদের জন্য সময়মতো জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থপাচার বন্ধ করা গেলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এতে বিমানবন্দরে হয়রানি কমবে এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য জামানতবিহীন সহজ ঋণের ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
ধর্মীয় বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইমাম, মোয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে অতীতের রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনের ভিত্তিতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চান। ভোটারদের উদ্দেশে তার আহ্বান, ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব দিন, পরদিন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। তরুণ ভোটারদের প্রতি তিনি বলেন, তাদের প্রথম ভোট হোক ধানের শীষের পক্ষে।
